হিমেল রাতের বিষ-ফুল
-কৃষ্ণনীল
∼∼∼∼∼∼∼∼∼∼∼
আকাশের ক্ষত থেকে ঝরে পড়া লালচে-কুয়াশায় আমি লুকিয়ে থাকি,
সোনালি পালকের মতো ভাসমান, যেন এক অদৃশ্য পাখির ডানা ছিঁড়ে গেছে রাতের গর্ভে।
দূরের মরীচিকায় ফুটে ওঠে এক নীলকান্তমণির বাগান,
যেখানে ফুলের পাপড়ি গলে যায় দুধের নদীতে, আর ছায়ারা নাচে অন্ধকারের তালে।
চাঁদের চোখে জমে থাকা হিমশীতল অশ্রু, যেন স্ফটিকের শরীরে বন্দি এক প্রাচীন গান,
আমাকে ডাকে সেই সুরে—ভাঙা দর্পণের টুকরোয় প্রতিফলিত, অসম্ভব নীলের ঢেউয়ে।
কোনও অচেনা বাতাসের স্পর্শে জাগে স্মৃতির অদ্ভুত প্রাণী,
পাতার শিরায় লুকোনো বিষ-মধু, যা ঠোঁটে লাগলে স্বপ্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে শরীরে।
মরুভূমির হলুদ চামড়ায় খোদাই করা রহস্যের লিপি,
যেন এক দানবীয় ফুলের কাঁটা চুরি করে নিয়েছে আমার হৃদয়ের ছায়া।
আমি হাঁটি সেই পথে, যেখানে বালির দানা হয়ে উঠেছে তারার খণ্ডিত আলো,
আর নীল ঔষধির ঘ্রাণে ভিজে যায় আমার অস্থি, যেন স্বপ্নের অমৃত-বিষ।
প্রাসাদের ছাদে জমে থাকা ধুলোর মধ্যে জন্মায় এক অদৃশ্য বন,
যার পাতায় লেখা আছে প্রেমের অসমাপ্ত গল্প, কালির পরিবর্তে নীল ব্যথার দাগে।
চাঁদ নামলে সেই বনে ফুটে ওঠে কাঁচের টুপটুপে ফল, ভিতরে বন্দি একটি নির্জন হাসি,
আমি ছুঁয়ে দেখি—যেন আমারই মুখ, কিন্তু অচেনা, দূরের ঝড়ে ক্লান্ত।
রাতের গভীরে আমি চাষ করি এক বিষাক্ত সোনালি বীজ,
যা অঙ্কুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে শিরায়, যেন অন্ধকারের নরম কাঁটা।
দূর নীলাকাশের চূড়ায় ঝুলে থাকা আলোর সুতোয় বাঁধা আমার ছায়া,
প্রতি নিশ্বাসে ফিরে আসে সেই প্রিয়ার স্পর্শ, যেন স্বপ্নের অদৃশ্য জাল।
খোয়াইয়ের জলে ভাসমান এক অদ্ভুত প্রতিবিম্ব, যেন আমারই শরীর কিন্তু অপরিচিত,
নীল মরুদ্যানের হাওয়ায় মিশে যায় তার ঘ্রাণ, বিষণ্ণ কিন্তু অপরাজিত।
আমি দাঁড়াই সেই সীমানায়, যেখানে চাঁদের আলো হয়ে উঠেছে সোনার তরবারি,
আর স্বপ্নের দেশে ফিরি বারবার, প্রণয়ের অদৃশ্য ডানায় ভর করে।
এক নির্জন রাতে, মাটির গভীরে শুনি এক হাহাকারের সুর,
যেন চাঁদের হৃদয় থেকে ঝরে পড়া নীল অশ্রু, আমাকে ডেকে নিয়ে যায় দূরে।
আমার নাম লেখা থাকে সেই আলোয়, অপ্রকাশ্য কিন্তু চিরন্তন,
প্রেমের বিষাদে ভিজে, স্বপ্নের নীল ছায়ায় আমি গাই—তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য।
∼∼∼∼∼∼∼∼∼∼∼
লেখক পরিচিতি
আমি কৃষ্ণনীল—পেশাগতভাবে বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হলেও অন্তরে একজন কবি, গীতিকার ও সুরকার। সাহিত্য ও সংগীত আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য আশ্রয়। আধুনিক জীবনের টানাপোড়েন, ভালোবাসা, স্বপ্নভঙ্গ ও মানবিক অনুভব আমার কবিতার প্রধান অনুপ্রেরণা।
আমার জন্ম ১৯৭৪ সালে কলকাতায়। পূর্বপুরুষের নিবাস অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়, যা আমার ভাবনাচিন্তা ও আবেগের গভীরে প্রোথিত। শিক্ষাগত যোগ্যতায় আমি মার্কেটিংয়ে এম.বি.এ ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে কলকাতায় বসবাস করছি।
পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি আমি একজন পেশাদার ইংরেজি পাক্ষিক নিউজলেটারের Editor-in-Chief, যেখানে বৈশ্বিক কর্পোরেট জগতের সাম্প্রতিক সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে আমি বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন ও পত্র-পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি।
আমার কাছে লেখালিখি কেবল শিল্পচর্চা নয়—এ এক অন্তর্মুখী যাত্রা, আত্মপ্রকাশের ভাষা এবং সময়ের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের এক নীরব প্রয়াস।

