শেকড়
-দেওয়ান আবুল হাশেম
∼∼∼∼∼∼∼∼∼
শেকড় মাটির নিচে থাকে, চোখে পড়ে না।
ফুলের মতো সুন্দর নয়, পাতার মতো দুলে না।
ফলের মতো প্রশংসাও পায় না।
তবু গাছের জীবন তার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি দেখেছি, মানুষ ফুল দেখে, ফল দেখে, সবুজ পাতা দেখে।
কিন্তু খুব কম মানুষ মাটির নিচের অন্ধকারে
নীরবে কাজ করে যাওয়া শেকড়ের কথা ভাবে।
একদিন আমি একটি শেকড়ের বুকে স্টেথোস্কোপ রাখলাম।
শুনলাম— মাটির ভেতর দিয়ে জল ওঠার শব্দ।
পুষ্টি ছড়িয়ে পড়ার শব্দ, নীরব শ্রমের শব্দ।
তারপর গভীরে একটি স্থির হৃদস্পন্দন।
ধুক… ধুক… ধুক…
যেন সে বলছে— “আমাকে দেখা যায় না, তাই বলে আমি অপ্রয়োজনীয় নই।”
আমি ভাবলাম, সমাজেরও শেকড় আছে।
পরিবার, সংস্কৃতি, ভাষা, স্মৃতি, মূল্যবোধ।
এইসব অদৃশ্য জিনিসই একটি সমাজকে দাঁড় করিয়ে রাখে।
বড় বড় ভবন শহর তৈরি করতে পারে।
কিন্তু শেকড় ছাড়া সভ্যতা তৈরি করতে পারে না।
আমি দেখেছি, কিছু মানুষ এত দ্রুত সামনে ছুটে যায় যে পেছনে তাকাতে ভুলে যায়।
তারা জানতে চায় কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু ভুলে যায় কোথা থেকে এসেছে।
তখন শেকড় ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়।
আর শেকড় শুকিয়ে গেলে গাছ প্রথমে টের পায় না।
পাতা তখনও সবুজ থাকে, ফুলও ফোটে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটি বিপর্যয় শুরু হয়ে যায়।
আমি আরও দেখেছি, শেকড় মানে শুধু অতীত আঁকড়ে ধরা নয়।
শেকড়ের কাজ গাছকে মাটিতে বেঁধে রাখা,
যাতে সে আকাশের দিকে আরও উঁচু হতে পারে।
তাই শেকড় অগ্রগতির শত্রু নয়, অগ্রগতির ভিত্তি।
যে গাছের শেকড় গভীর, তার ডালপালা আরও দূরে ছড়ায়।
সন্ধ্যায় আমি একটি বিশাল বটগাছের নিচে দাঁড়াই।
তার ছায়া বিস্তৃত, তার ডালপালা দূর পর্যন্ত গেছে।
মানুষ তার সৌন্দর্য দেখে।
আমি ভাবি— এই মহিমার অর্ধেকও মাটির ওপরে নয়।
মাটির নিচে, অদৃশ্যের মধ্যে।
আমি মনে মনে লিখে রাখি—
যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা সবসময় দৃশ্যমান হয় না।
যেমন হৃদয়কে চোখে দেখা যায় না,
তবু জীবন তার ওপর নির্ভর করে।
তেমনি সমাজের শেকড়ও চোখে পড়ে না,
তবু ভবিষ্যৎ তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
স্টেথোস্কোপ কানে নিয়ে আমি শুনি—
শেকড়ের হৃদস্পন্দন খুব গভীর, খুব ধীর, খুব নির্ভরযোগ্য।
কারণ সে জানে, ঝড় এলে ডালপালা কাঁপবে; পাতা ঝরবে,
কিন্তু শেকড় বেঁচে থাকলে গাছ আবারও নতুন পাতা মেলবে।
নতুন জীবন শুরু করবে।
∼∼∼∼∼∼∼∼∼
পরিচিতি-
কবি দেওয়ান আবুল হাশেম – বিএসএস, ডিএমএফ, ফার্মাসিস্ট; শিক্ষক, সংগঠক ও চিকিৎসক। পিতা : মোঃ আব্দুর রহিম দেওয়ান ও মাতা বিবি হাজেরা দেওয়ান। জন্ম ১/১/১৯৮৪ (সার্টিফিকেট), প্রাণীমন্ডল, মাইজপাড়া, রাঢ়ীখাল, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ। কবিতার সংখ্যা ৬০০০+, বাংলা সনেটে নিজস্বধারার প্রবর্তক। সনেট ছাড়াও বাংলা কবিতায় আরও কিছু নিজস্বধারার প্রবর্তক।
কবিতার পাতা মনের কথা শুনুন,প্রাণের কথা লিখুন