অপেক্ষার প্রহর
-মোহাম্মদ ছোলেমান ভূঁইয়া
∞∞∞∞∞∞∞∞∞
গোধূলি লগ্ন।চারিদিকে আঁধার নেমে এসেছে। একটু পর হয়তো সূর্য ডুবে যাবে। আঁধার দূর করার জন্য রেল স্টেশনের নিয়ন বাতিগুলো জ্বলে উঠে। হঠাৎ স্টেশনের সুনসান নীরবতা ভেদ করে আসছে দৈত্যাকায় ট্রেন। স্টেশনে যাত্রী হকার ও ভিক্ষুকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সম্রাট চেঙ্গিস খানের ঘোড়ার খুড়ের মতো ঠক্ ঠক্ করে এগিয়ে আসে নুরচান।জন্ম থেকেই তাঁর একটি পা খোড়া। আখাউড়া রেল স্টেশনে একটি খুপরি ঘরে সে বসবাস করে। রেল স্টেশন ও ট্রেনে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে। নুরি কুমিল্লা
রেল স্টেশনের পাশে পলিথিনে মোড়ানো একটি খুপরি ঘরে বসবাস করে। জন্ম থেকেই সে প্রতিবন্ধী।
হাটু থেকে নিচ পর্যন্ত তাঁর দুই পা নেই। হাতে ভর করে কুমিল্লা রেল স্টেশনে ভিক্ষা করে। নুরির বয়স প্রায় বাঁইশ তেইশ বছর বয়স।দুধে আলতা গায়ের বরন।যৌবন যেন গা থেকে উপচে পড়ছে। নুরচান প্রায়ই এসে জিজ্ঞেস করে,”কেমুন আছো নুরি?”
নুরি শান্ত গলায় জবাব দেয়,” ভালা আছি নুরচান ভাই।”
নুরচান আড় চোখে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকে নুরির ডাঙর গতরের দিকে। নুরচানের এই তাকানো দেখেই নুরি বুঝতে পারে সে তাঁকে পছন্দ করে। নুরিও নুরচানকে মনে মনে ভালোবেসে ফেলে। নুরচান সবসময়ই নুরির পাশে ঘুরঘুর করে। প্রায়ই নুরচান বাটার বন ও দুধ চা এনে দু’জন মিলে খায়।মাঝে মধ্যে ঠাট্টা মশকরা ও হাসি তামাশায় মেতে থাকে।
বর্ষাকাল,হঠাৎ আকাশ ভারী হয়ে বৃষ্টি নামে। গুটিশুটি মেরে খুপরিতে শুয়ে থাকে নুরি। নুরচান
এক প্যাকেট বিরানি নিয়ে এসে বলে,”ওঠ,নুরি ওইঠ্যা খাইয়া ল,অনেক রাইত অইলো। এহনো বোধ অয় পেটে কিচ্ছু পড়ে নাই। “
দু’জন মিলে বিরানি খেয়ে একটা বিড়ি ধরায় নুরচান।
নুরিও বিড়ির অর্ধেক ফুক ফুক করে টানে। নুরি খুপরির দরজা টেনে দিয়ে শুয়ে পড়ে। নুরচানের লোমশ বুকে নাক ঘষে আর সুখের আর্তনাদ করে বলে,”আমায় কোনোদিন একা ফেলে যেও না নুরচান ভাই, এভাবে হারা জীবন শক্ত কইরা ধইরা রাইখো।”
সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখে নুরচান নেই। তাকে কিছু না বলেই চলে গেছে। প্রায় দশ বছর চলে গেছে। নয় বছরের মেয়ে মনিকে নিয়ে আজও অপেক্ষার প্রহর গুনে নুরি।
∞∞∞∞∞∞∞∞∞
লেখক পরিচিতিঃ
কবি মোহাম্মদ ছোলেমান ভূঁইয়া ৪ঠা এপ্রিল ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার বক্রিকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।পিতা আবদুল জলিল ভূঁইয়া ও মাতা মোসাঃ ছালেহা বেগম।
তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। বর্তমানে চান্দিনা মোকাম বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি বিভিন্ন পত্রিকা ও সাহিত্য গ্রুপে লেখালেখি করে থাকেন। তিনি একাধারে এক জন কবি, ছড়াকার, গল্পকার, উপন্যাসিক ও শিক্ষক।
মেঘলা আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ, নীলার মনে নীল দুঃখ, আলোয় ফেরার রইলো নিমন্ত্রণ, তিমির বিনাশী বাতিঘর, মন গহীনে পোড়ে মন, এক অকিঞ্চন আত্মভোলা ও অতিক্রান্ত স্টেশনের গল্প’ তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি।
তিনি আন্তর্জাতিক কবি ও সাহিত্যিক পরিষদ কর্তৃক ‘গ্রন্থ সম্মাননা-২০২৫ ইং’ পীরে কামেল দেওয়ান মাহবুবুল আলম চিশতী(রঃ)’সাহিত্য পুরস্কার -২০২৫ ইং’ বাংলাদেশ কবি ও সাহিত্যিক(বাকসাপ) কর্তৃক ‘কাব্য পুরস্কার-২০২৬ ইং ও হাজার কবির কবিতা কর্তৃক ‘জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার-২০২৩ ইং এ ভূষিত হয়েছেন।
কবিতার পাতা মনের কথা শুনুন,প্রাণের কথা লিখুন